© GOPIKA KANTA DUTTA (GK DUTTA) Version 5.1 Responsive

শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে MGNREGA প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে ঐতিহাসিক রায়!

উত্তর ত্রিপুরার যুবরাজনগর আরডি ব্লকের অন্তর্গত শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (MGNREGA) প্রকল্পে সংঘটিত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘ আইনি লড়াই অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ রায়ে উপনীত হয়েছে।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা তদন্ত ও শুনানির পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রিপুরা লোকায়ুক্ত মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। এই রায়ে প্রশাসনিক অনিয়ম এবং সরকারি তহবিল ব্যবহারে গুরুতর অসংগতির বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই মামলা শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়মের বিচার নয়; এটি গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

মামলার সূচনা: প্রকৃত শ্রমিকদের বঞ্চিত করার অভিযোগ!

অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে MGNREGA প্রকল্পের অধীনে কর্মসংস্থান প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম ঘটে অভিযোগে বলা হয়, শ্রীপুর গ্রামের প্রকৃত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান না দিয়ে পাশের পশ্চিম দেওয়ানপাশা গ্রামের ৫৫টি জব কার্ড ব্যবহার করে ৯২ জন শ্রমিকের নামে প্রায় ২,৪২,৬০৮ টাকা উত্তোলন করা হয়। এর ফলে শ্রীপুর গ্রামের বহু প্রকৃত জব কার্ডধারী শ্রমিক তাদের ন্যায্য কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হন।

অভিযোগকারীর ভূমিকা: RTI দিয়ে দুর্নীতি উন্মোচন!

এই ঘটনাটি সামনে আনেন শ্রী গোপীকা কান্ত দত্ত, পিতা শ্রী গোপাল কৃষ্ণ দত্ত। তিনি শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের স্থায়ী বাসিন্দা এবং জেলা আইনসেবা কর্তৃপক্ষ, উত্তর ত্রিপুরার একজন প্যারা লিগ্যাল ভলান্টিয়ার। তিনি তথ্য অধিকার আইন (RTI) ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি নথি সংগ্রহ করেন।
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পঞ্চায়েত রেজোলিউশন, কাজের আদেশ, মাস্টার রোল, প্রকৃত কাজের বিবরণ এই সব নথির মধ্যে গুরুতর অসংগতি রয়েছে। প্রথমে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে ত্রিপুরা লোকায়ুক্তের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়।

মামলার বিবাদীপক্ষ:

এই মামলায় মোট সাতজনকে বিবাদী করা হয়। তারা হলেন:
শ্রী অনুপম দাস - তৎকালীন ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার, যুবরাজনগর আরডি ব্লক
শ্রী অভিজিৎ দাস - তৎকালীন ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার, যুবরাজনগর আরডি ব্লক
শ্রী শ্রীপদ দাস - চেয়ারম্যান, যুবরাজনগর পঞ্চায়েত সমিতি (বর্তমানে উত্তর ত্রিপুরা জেলা পরিষদের সদস্য)
শ্রী চিরঞ্জিত নাথ - জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার-II, যুবরাজনগর আরডি ব্লক
শ্রী সঞ্জয় ভৌমিক - প্রধান, শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত (বর্তমানে উপপ্রধান)
শ্রী বরুন দত্ত - পঞ্চায়েত সচিব, শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত
শ্রী কোহিনুর দত্ত - গ্রাম রোজগার সেবক (GRS), শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত

তিন বছরব্যাপী শুনানি:

মামলাটি প্রায় তিন বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত ও শুনানির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। লোকায়ুক্তের সামনে উপস্থাপন করা হয, পঞ্চায়েত রেজোলিউশন, মাস্টার রোল, কাজের আদেশ, RTI এর মাধ্যমে সংগৃহীত নথিপত্র। বিবাদীপক্ষ একাধিকবার দাবি করে যে ঘটনাটি “Bonafide Mistake” বা অনিচ্ছাকৃত ভুল। কিন্তু অভিযোগকারী পক্ষের উপস্থাপিত নথিভিত্তিক প্রমাণ সেই দাবি সমর্থন করেনি। তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক অনিয়ম এবং তথ্য গোপনের ঘটনা ঘটেছে।

মামলার সাক্ষীরা:

বিবাদী পক্ষের সাক্ষী
শ্রীমতি সবিতা পাল — প্রাক্তন সদস্যা, শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত
শ্রীমতি পাপলি দাস — প্রাক্তন সদস্যা, শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত

অভিযোগকারী পক্ষের সাক্ষী
শ্রী রামানুজ ভট্টাচার্য্য — প্রাক্তন উপপ্রধান, শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত

লোকায়ুক্তের চূড়ান্ত রায়:

দীর্ঘ শুনানি শেষে ত্রিপুরা লোকায়ুক্ত শ্রী বিভাস কান্তি কিলিকদার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মামলার চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।প্রাথমিক তদন্ত পর্যায়ে দুইজন তৎকালীন ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার; শ্রী অনুপম দাস এবং শ্রী অভিজিৎ দাসকে মামলার পরবর্তী তদন্ত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট পাঁচজন বিবাদীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও শুনানি চলতে থাকে এবং  পাঁচজন অভিযুক্ত শ্রী শ্রীপদ দাস, শ্রী চিরঞ্জিত নাথ, শ্রী সঞ্জয় ভৌমিক, শ্রী বরুন দত্ত, ও শ্রী কোহিনুর দত্ত কে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয, প্রকৃত উপকারভোগীদের বঞ্চিত করা হয়েছে অন্য গ্রামের জব কার্ড ব্যবহার করে কর্মসংস্থান দেখানো হয়েছে সরকারি তহবিলের অপব্যবহার ঘটেছে এবং মাননীয় লোকায়ুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন।
 

ORMD09149ZD07777